সেমিনারে বক্তারা

টেকসই প্যাকেজিং হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় রফতানি খাত

বিশ্বব্যাপী টেকসই (সাস্টেইনেবল) প্যাকেজিংয়ের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের বৈশ্বিক বাজারের আকার ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন পরিবেশগত মানদণ্ড এবং রফতানি বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য টেকসই প্যাকেজিং শিল্প একটি নতুন রফতানি দিগন্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কমপ্লায়েন্স, রিসাইক্লিং অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘বাংলাদেশ নিউ এক্সপোর্ট ফ্রন্টিয়ার: সাস্টেইনেবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ তথ্য উঠে আসে। এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক খালিদ মাহমুদ।

প্লাস্টিক প্রডাক্ট বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (পিপিবিপিসি), বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন বিপিজিএমইএর সভাপতি সামিম আহমেদ।

মূল প্রবন্ধের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রায় ৬ হাজার উৎপাদন ইউনিটের মাধ্যমে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮৩ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ শিল্পে।

প্রবন্ধে আরো বলা হয়, গত অর্থবছরে প্লাস্টিক পণ্যের সরাসরি রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার, যা বছরে ২০ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং পণ্য পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে প্যাকেজিং শিল্পের বাজারমূল্য ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এর মধ্যে টেকসই প্যাকেজিং খাতের আকার ৩০০ থেকে ৪৪০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। বছরে ৭-৯ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি পাওয়া এ খাত বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা।

চলতি বছরের আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হতে যাওয়া ইইউর প্যাকেজিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ওয়েস্ট রেগুলেশনের (পিপিডব্লিউআর) আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করা সব ধরনের প্যাকেজিংকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের ধরনভেদে ৩০-৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহৃত উপাদান ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকবে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ অব্যাহত রাখতে হলে এসব শর্ত পূরণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় রফতানি সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের গুরুত্ব এবং নতুন বাণিজ্যিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিল্প খাতকে প্রস্তুত করতে পারলে টেকসই প্যাকেজিং বাংলাদেশের পরবর্তী রফতানি সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

সেমিনারে বিপিজিএমইএ সভাপতি সামিম আহমেদ বলেন, প্যাকেজিং হচ্ছে ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’। প্যাকেজিং ছাড়া কোনো পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব নয়। এটি শুধু পণ্যের সুরক্ষাই দেয় না, বরং পণ্যের স্থায়িত্ব বা সেলফ লাইফ বাড়িয়ে পজিটিভ কার্বন নিঃসরণে ভূমিকা রাখছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘সারা বিশ্ব এখন ইথিক্যাল কনজিউমারিজমের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের এখন সিএসআরের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বের মতো ইপিআর বা বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা ব্যবস্থা চালু করার কথা ভাবতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিপিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কেএম ইকবাল হোসেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মো. রাজ্জাকুল ইসলাম, লুনা প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ ফ্লেক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সফিউস সানি আলমগীর, এসিআইয়েরে ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর আনিসুর রহমান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং ডিরেক্টর চৌধুরী কামরুজ্জামানসহ খাতসংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও